প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সাফল্য, সাবিনা খাতুনের নেতৃত্ব এবং নতুন প্রজন্মের উত্থান নিয়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রার গল্প।
এক সময় যে খেলাটিকে সমাজের অনেকেই মেয়েদের জন্য উপযুক্ত মনে করতেন না, সেই ফুটবলেই আজ বাংলাদেশের নারীরা গোটা দেশকে গর্বিত করছেন। মফস্বলের ধুলোমাখা মাঠ থেকে উঠে আসা একঝাঁক তরুণী গত কয়েক বছরে যে সাফল্য এনে দিয়েছেন, তা শুধু ট্রফির হিসেবে নয়, একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁদের পথচলা এখন নতুন প্রজন্মের অসংখ্য মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় অর্জনটি এসেছে প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দল নিশ্চিত করে ঐতিহাসিক এই জায়গা, যা এর আগে কখনও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এশিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে একই মঞ্চে খেলার সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গ্রুপ সি-তে নিখুঁত অভিযান
বাছাইপর্বে গ্রুপ সি-তে বাংলাদেশ ছিল একেবারে অপ্রতিরোধ্য। প্রথমে বাহরাইনকে হারানোর পর ইয়াঙ্গুনে স্বাগতিক মিয়ানমারের বিপক্ষে ২-১ গোলের স্মরণীয় জয় দলকে চূড়ান্ত পর্বের দুয়ারে পৌঁছে দেয়। এরপর গ্রুপের শেষ ম্যাচে তুর্কমেনিস্তানকে ৭-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে নিখুঁত রেকর্ড নিয়ে অভিযান শেষ করে বাংলাদেশ। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দলটি এখন আর হঠাৎ চমকের নাম নয়।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরব

আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নারীরা ইতিমধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। ২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে নেয় দল, ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে। ঘরের মাঠে গ্যালারি ভরা দর্শকের সামনে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ট্রফি ধরে রাখার সেই মুহূর্ত বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
২০২৬ সাফের ফাইনালে হার
তবে সব গল্পই জয়ের নয়। ২০২৬ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে নেমে বাংলাদেশ আবারও ফাইনালে পৌঁছালেও এবার স্বাগতিক ভারতের কাছে ৩-১ গোলে হার মানতে হয়। গোয়ার মারগাওয়ে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে বাংলাদেশের একমাত্র গোলটি করেন ঋতুপর্ণা চাকমা। হার সত্ত্বেও টানা দ্বিতীয় ফাইনালে ওঠা প্রমাণ করে দলটি এই অঞ্চলের ধারাবাহিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সাবিনা খাতুন কিংবদন্তি
বাংলাদেশের নারী ফুটবলের কথা উঠলে সবার আগে যে নামটি আসে তা হলো সাবিনা খাতুন। দীর্ঘদিন ধরে দলের প্রাণভোমরা হয়ে থাকা এই ফরোয়ার্ড রেকর্ড অনুযায়ী দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ৬১টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ৩৮টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেও বসেছেন। মাঠের ভেতরে ও বাইরে তাঁর নেতৃত্ব একাধিক প্রজন্মের খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছে এবং দলকে বহু কঠিন লড়াইয়ে পথ দেখিয়েছে।
নতুন প্রজন্মের উত্থান
সাবিনার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের একঝাঁক প্রতিভাও এখন দলের শক্তির বড় উৎস। ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করা ঋতুপর্ণা চাকমা যেমন সাম্প্রতিক সাফের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে জাল খুঁজে নিয়েছেন, তেমনি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন মারিয়া মান্দা। গোলবারের নিচে অভিজ্ঞ রুপনা চাকমার নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি দলকে দিয়েছে আরও দৃঢ়তা, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় আশার বার্তা বহন করে।
কোচ পিটার বাটলারের অধীনে
দলের এই অগ্রযাত্রার পেছনে কোচিং স্টাফের ভূমিকাও কম নয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে দায়িত্ব নেওয়া ইংলিশ কোচ পিটার জেমস বাটলারের অধীনে দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে দলের ভেতরে কিছু অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন দেখা দিলেও তা শেষ পর্যন্ত সমাধান হয়ে যায় এবং খেলোয়াড়রা আবারও মাঠের পারফরম্যান্সে মনোযোগ দিতে সক্ষম হন।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি
মাঠের সাফল্যের প্রতিফলন পড়েছে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়েও। ২০২৬ সালের জুন মাসের হালনাগাদ অনুযায়ী ফিফা নারী র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ ১০৭তম স্থানে উঠে এসেছে, যা আগের অবস্থান থেকে পাঁচ ধাপ এগিয়ে। দলের সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং ছিল একশততম স্থান, আর ২০২২ সালের এক সময় তা নেমে গিয়েছিল ১৪৭ পর্যন্ত। এই উন্নতির ধারা বজায় রাখতে পারলে সামনের দিনে আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছানো অসম্ভব নয়।
সমাজে বদলের বার্তা
এই মেয়েদের অর্জন শুধু মাঠের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমাজেও এক নীরব পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যেসব পরিবার এক সময় মেয়েদের খেলাধুলায় পাঠাতে দ্বিধা করত, তারাই এখন জাতীয় দলের সাফল্য দেখে সন্তানদের মাঠে পাঠাতে উৎসাহ পাচ্ছে। গ্রামগঞ্জের অসংখ্য কিশোরী আজ সাবিনা কিংবা ঋতুপর্ণার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখে, আর এই স্বপ্নই দেশের নারী ফুটবলের ভবিষ্যৎ ভিত্তিকে আরও মজবুত করে তুলছে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
সাফল্যের এই গল্পের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজন এখনও নারী ফুটবলের বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে বেশি করে মেয়েদের ফুটবলে সম্পৃক্ত করা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এই দল আগামী বছরগুলোতে আরও বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখতে পারে।
সামনের পথ
এশিয়ান কাপের মঞ্চে পা রাখা থেকে শুরু করে সাফের ধারাবাহিক সাফল্য, বাংলাদেশের নারী ফুটবল এখন এক নতুন উচ্চতার দিকে এগিয়ে চলেছে। এই মেয়েরা শুধু ম্যাচ জিতছেন না, তাঁরা সমাজের পুরনো ধ্যানধারণাও ভেঙে দিচ্ছেন এবং প্রমাণ করছেন সঠিক সুযোগ পেলে তাঁরা দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে সক্ষম। সামনের পথ চ্যালেঞ্জে ভরা হলেও তাঁদের অদম্য মানসিকতা গোটা জাতিকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
এএফসি এশিয়ান কাপ নিয়ে দারুণ কভারেজ.

Keep subscribing to মিতু ইসলামHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
