বিদায়ী বছরটি বাংলাদেশের ক্রিকেট, বিশেষ করে ছোট সংস্করণের খেলায় ছিল দারুণ সাফল্যে ভরা, কারণ টাইগাররা শক্তিশালী কয়েকটি দলের বিপক্ষে একের পর এক ঐতিহাসিক সিরিজ জিতে গোটা দেশের কোটি সমর্থকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আবেগ ঠিক কতটা গভীর, তা নতুন করে বলার আসলে কিছু নেই, কারণ এই খেলা এখানে কেবল একটি সাধারণ খেলা নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও স্বপ্নের আরেক নাম। সদ্য বিদায় নেওয়া বছরটি সেই গভীর ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছে দারুণভাবে, বিশেষ করে ছোট সংস্করণের খেলায় টাইগারদের একের পর এক সাফল্য গোটা দেশকে নতুন করে আনন্দে ভাসিয়েছে।
ছোট সংস্করণে বড় সাফল্য
গত বছরটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য নানা দিক থেকেই ছিল বেশ মিশ্র অভিজ্ঞতায় ভরা একটি সময়, তবে ছোট সংস্করণ অর্থাৎ টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে পুরো দলের পারফরম্যান্স ছিল সত্যিই চোখে পড়ার মতো উজ্জ্বল ও ধারাবাহিক। এই সংস্করণে টাইগাররা মোট আটটি সিরিজের মধ্যে পাঁচটিতেই দারুণ জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ক্রমশ এক শক্তিশালী ও ভরসার দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই সাফল্যগুলোর মধ্যে আবার কয়েকটি ছিল একেবারে ঐতিহাসিক, যেগুলো এর আগে কখনোই অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি দলটির পক্ষে। শক্তিশালী সব প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন ধারাবাহিক জয় স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, সীমিত ওভারের এই আকর্ষণীয় খেলায় বাংলাদেশ এখন আর মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ নয়, বরং যেকোনো বড় দলের জন্যই রীতিমতো ভয়ের কারণ হয়ে উঠছে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম

বিদায়ী বছরের অন্যতম সেরা অর্জনটি আসে শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে, যাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ এর আগে কখনো কোনো টি টোয়েন্টি সিরিজ জিততে পারেনি নিজেদের ইতিহাসে। গত জুলাই মাসে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই দারুণ রোমাঞ্চকর সিরিজে টাইগাররা দুই এক ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ইতিহাসে একেবারে নতুন ও গৌরবময় একটি অধ্যায় যুক্ত করে।
এই অসাধারণ জয় কেবল একটি সিরিজ জেতার সাময়িক আনন্দই বয়ে আনেনি, বরং পুরো দলের সামগ্রিক আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঠে তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দারুণ সমন্বয়ে গড়া দলটি সেদিন প্রমাণ করে দেয় যে, বড় মঞ্চে প্রবল চাপ সামলে কীভাবে একদম ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ জিততে হয়, তা তারা এখন ভালোভাবেই রপ্ত করে ফেলেছে।
শ্রীলঙ্কাতেও ইতিহাস
পাকিস্তানের বিপক্ষে পাওয়া সেই বড় সাফল্যের রেশ ভালোভাবে কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশ আরও একটি স্মরণীয় কীর্তি গড়ে তোলে দূরের শ্রীলঙ্কার মাটিতে গিয়ে। সেখানে সফরের সময় টাইগাররা স্বাগতিকদের বিপক্ষে নিজেদের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি টি টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের স্বাদ পায়, যা ছিল দেশের সমর্থকদের জন্য সত্যিই অভাবনীয় এক দারুণ উপহার।
প্রতিপক্ষের একেবারে চেনা মাঠে, তাদেরই উৎসাহী দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে এমন একটি সিরিজ জেতা মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না দলটির জন্য। কিন্তু দলের খেলোয়াড়েরা অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা ও পরিণত দক্ষতার পরিচয় দিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও ভেঙে না পড়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান, এবং তারই মধুর পুরস্কার হিসেবে ঘরে তোলেন আরও একটি মূল্যবান শিরোপা।
আরও কিছু সিরিজ জয়
এই দুটি বড় ও ঐতিহাসিক সাফল্যের পাশাপাশি বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিরিজ জিতে নিজেদের দারুণ ধারাবাহিকতার স্পষ্ট প্রমাণ রাখে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুই শূন্য ব্যবধানে একটি টি টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও ছোট সংস্করণে সিরিজ জিতে দলটি নিজেদের জয়ের ধারা বেশ ভালোভাবেই অব্যাহত রাখে।
শুধু ছোট সংস্করণেই নয়, এক দিনের সংস্করণেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি সিরিজ জিতে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় পর সেই ফরম্যাটেও সাফল্যের মুখ দেখতে পায়। এছাড়া বছরের একেবারে শেষ দিকে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি টেস্ট সিরিজ জিতে দলটি আবারও প্রমাণ করে যে, তারা ক্রিকেটের প্রতিটি সংস্করণেই ধাপে ধাপে উন্নতির আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাফল্যের পেছনের কারণ
এই ধারাবাহিক ও চোখধাঁধানো সাফল্যের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে বলে মনে করেন দেশের অভিজ্ঞ ক্রিকেটবোদ্ধারা। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে দলের তরুণ খেলোয়াড়দের নির্ভীক ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা, যারা বড় দলের বিপক্ষেও কোনো রকম ভয় না পেয়ে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে যেতে পেরেছেন পুরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
এর পাশাপাশি অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পরিণত ও বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব এবং পুরো দলের মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা দারুণ বোঝাপড়াও এই বড় অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ব্যাট, বল ও ফিল্ডিং, খেলার এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগেই সমন্বিত পারফরম্যান্স দলটিকে কঠিন মুহূর্তগুলোতে এগিয়ে থাকতে এবং একের পর এক ম্যাচ জিততে অনেকখানি সাহায্য করেছে।
সামনে তাকিয়ে
এমন একটি সাফল্যমণ্ডিত ও গৌরবময় বছরের পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের সমর্থকদের প্রত্যাশা আরও অনেক বেড়ে গেছে, এবং তারা এখন প্রিয় দলের কাছে আরও বড় বড় অর্জন দেখতে চায় খুব করেই। সামনে অপেক্ষা করা বিভিন্ন বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টাইগাররা এই দুর্দান্ত ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে আরও অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিতে পারবে বলেই আশা করা যায়।
তবে এই সাফল্যের ধারা ধরে রাখা মোটেও সহজ কোনো কাজ হবে না, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন প্রতিটি দলই দিন দিন আরও বেশি শক্তিশালী ও সংগঠিত হয়ে উঠছে। তা সত্ত্বেও বিদায়ী এই বছরটি বাংলাদেশের অগণিত ক্রিকেটপ্রেমীর মনে যে গভীর বিশ্বাস ও নির্মল আনন্দের বীজ বুনে দিয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনগুলোর জন্য এক শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।
Frequently asked questions

Keep subscribing to মিতু ইসলামHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
