সফটওয়্যার আর ফ্রিল্যান্সিংয়ের পর বাংলাদেশ এবার নজর দিচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে। ব্যয়বহুল ওয়েফার কারখানার পথে না গিয়ে দেশটি বেছে নিচ্ছে চিপ ডিজাইন ও প্যাকেজিং-টেস্টিং। জাতীয় টাস্কফোর্স, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি ডলার রপ্তানির লক্ষ্য আর প্রতিযোগিতামূলক কম খরচ,কতটা বাস্তব এই স্বপ্ন?
স্মার্টফোন থেকে গাড়ি, চিকিৎসা যন্ত্র থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—আধুনিক পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি যন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছে ছোট্ট একটি সেমিকন্ডাক্টর চিপ, আর সফটওয়্যার ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে সাফল্যের পর বাংলাদেশ এবার এই বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে নিজের জায়গা করে নিতে চাইছে, তবে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশল নিয়ে।
জাতীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ
এই লক্ষ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার গঠন করেছে একটি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স, যেখানে একত্র হয়েছেন শিক্ষাবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা, যাঁরা মিলে খাতটির জন্য একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা তৈরির কাজ করছেন।
টাস্কফোর্স দক্ষতা উন্নয়ন, নীতি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সংযোগকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আর পুরো পরিকল্পনাকে সাজিয়েছে তিনটি ধাপে—স্বল্পমেয়াদি (২০২৫-২০২৬), মধ্যমেয়াদি (২০২৭-২০২৯) এবং দীর্ঘমেয়াদি (২০৩০ ও তার পরবর্তী সময়)—যাতে অগ্রগতি পর্যায়ক্রমে পরিমাপযোগ্য থাকে।
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই মুহূর্তটিকে অনেকে বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগের জানালা হিসেবে দেখছেন, কারণ বড় শক্তিগুলো যখন সরবরাহ শৃঙ্খলে কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে, তখন নতুন ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য অংশীদার খোঁজা হচ্ছে, আর সেই তালিকায় নিজের নাম লেখাতে চায় ঢাকা।
৮ মিলিয়ন বনাম ১০০ কোটি ডলারের ব্যবধান
বর্তমান বাস্তবতা অবশ্য এখনও অনেকটাই ছোট: বাংলাদেশ থেকে সেমিকন্ডাক্টর, মূলত চিপ ডিজাইন সেবা রপ্তানি বছরে প্রায় ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো, আর এই কাজে সরাসরি যুক্ত আছেন প্রায় ৭০০ জন চিপ ডিজাইনার, যা সম্ভাবনার তুলনায় এখনও নিছক একটি সূচনামাত্র বলা যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে এই রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার, অর্থাৎ বর্তমান অবস্থান থেকে শতগুণেরও বেশি প্রবৃদ্ধির এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন সহজ নয় বলেই একটি স্পষ্ট কৌশল অপরিহার্য।
ওয়েফার নয়, নকশাই পথ

এখানেই বাংলাদেশের কৌশল অন্যদের থেকে আলাদা: বিপুল পুঁজি ও বিদ্যুৎনির্ভর ওয়েফার কারখানা গড়ার পথে না হেঁটে দেশটি বেছে নিচ্ছে মূল্যশৃঙ্খলের দুই প্রান্ত—সামনের দিকে চিপ ডিজাইন সেবা এবং পেছনের দিকে প্যাকেজিং ও টেস্টিং, যেগুলোতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে অপেক্ষাকৃত দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
এই ডিজাইন-নির্ভর পথ বেছে নেওয়ার যুক্তিও সরল: একটি অত্যাধুনিক ওয়েফার কারখানা তৈরিতে যে বিপুল অর্থ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, তা এখনই জোগানো কঠিন, অথচ দক্ষ প্রকৌশলীনির্ভর ডিজাইন সেবায় বাংলাদেশ তার তরুণ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো দক্ষ জনবল; উন্নত ডিজাইন সরঞ্জামে প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পের ঘনিষ্ঠ সংযোগ এবং হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা ছাড়া নকশা সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
প্রণোদনা ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা
খাতটিকে এগিয়ে নিতে প্রস্তাব করা হয়েছে আকর্ষণীয় সব সুবিধা, যার মধ্যে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং সেবার জন্য দীর্ঘ ২০ বছরের কর অবকাশ এবং রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ প্রণোদনা, যা বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
প্রতিযোগিতার জায়গাতেও বাংলাদেশের হাতে রয়েছে একটি বড় তুরুপের তাস—পরিচালন ব্যয়; ঢাকায় চিপ ডিজাইন সেবার খরচ ভারতের বেঙ্গালুরুর চেয়ে প্রায় ১৬ থেকে ২০ শতাংশ এবং ফিলিপাইনের সেবুর চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম, আর এই দুই শহরই বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম সক্রিয় সেমিকন্ডাক্টর সেবা কেন্দ্র।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রা এখনও প্রাথমিক ধাপে, তবে স্পষ্ট লক্ষ্য, বাস্তবসম্মত কৌশল এবং তরুণ দক্ষ জনশক্তির সমন্বয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির পরের বড় অধ্যায়, যেখানে চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে ধারাবাহিক নীতি ও নিরন্তর দক্ষতা উন্নয়নের ওপর।
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ২০২৬ নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি.
এখানে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ২০২৬ নিয়ে অনেক শিখলাম.

Keep following আরিফ হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Follow