স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক চালুর পর বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নতুন সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়েছে। তবে সেবার উচ্চ মূল্য নিয়ে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত গত এক দশকে চোখে পড়ার মতো বিকশিত হয়েছে, তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় বাধা রয়ে গেছে, আর তা হলো নির্ভরযোগ্য ও দ্রুতগতির ইন্টারনেটের অভাব। ঠিক এই জায়গাতেই স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের আগমন নতুন করে আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাটি এখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও উচ্চগতির সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাব্য মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
স্টারলিংকের যাত্রা শুরু
বাংলাদেশে স্টারলিংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের ২০ মে তারিখে। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৮ এপ্রিল স্টারলিংককে দেশে কার্যক্রম চালানোর লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছিলেন, যা এই সেবার পথ অনেকটাই সুগম করে দেয়।
চালুর পর অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের মধ্যেই সেবাটি ব্যবহারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। পরিসংখ্যান বলছে, যাত্রা শুরুর প্রথম ১৫০ দিনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দেড় হাজারেরও বেশি গ্রাহক স্টারলিংকের সংযোগ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন, যা আগ্রহের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে ধরা হচ্ছে।
দাম কত, গতি কত
সেবার মান ও গতির দিক থেকে স্টারলিংক বেশ আকর্ষণীয় প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, এই সংযোগে সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাবিটস পর্যন্ত গতি পাওয়া সম্ভব এবং সঙ্গে থাকছে কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছাড়াই আনলিমিটেড ডেটা ব্যবহারের সুবিধা, যা অনেকের কাছেই বেশ লোভনীয়।
তবে এই সুবিধা পেতে গ্রাহকদের তুলনামূলক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। মাসিক প্যাকেজের দাম শুরু হচ্ছে ৪ হাজার ২০০ টাকা থেকে, আর যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য এককালীন ৪৭ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই উচ্চ মূল্য সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে নতুন সম্ভাবনা

স্টারলিংক নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী দেশের বিশাল ফ্রিল্যান্সার সম্প্রদায়। বাংলাদেশ বর্তমানে অনলাইন শ্রমবাজারে সরবরাহের দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্বের মোট ফ্রিল্যান্সারের প্রায় ১৬ শতাংশই এই দেশের, যা এক অসাধারণ অর্জন বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের বার্ষিক আকার প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। নির্ভরযোগ্য ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এই খাতের পেশাজীবীদের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা দূর করতে পারে, বিশেষত যারা রাজধানীর বাইরে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কাজ করে থাকেন।
ডিজিটাল অর্থনীতির চিত্র
স্টারলিংকের এই সম্ভাবনা আরও ভালোভাবে বোঝা যায় দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির চিত্রের দিকে তাকালে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবা রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৪০ কোটি ডলারে, আর এই খাত প্রতি বছর প্রায় ৪০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই খাতের ভিত্তিও যথেষ্ট মজবুত বলে বলা যায়। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে তাদের সেবা রপ্তানি করছে। এত বড় একটি অবকাঠামোর জন্য উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ দিন দিন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নতুন এক মাইলফলক
সম্প্রতি আরও একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত এসেছে, যা স্টারলিংকের ভূমিকাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সরকার একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যার আওতায় স্টারলিংক দেশ থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত ইজারা সংযোগের মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পরিবহন করতে পারবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রথমবারের মতো সরকার কোনো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সরবরাহকারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের ব্যবস্থার অনুমতি দিল। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ সংযোগই নয়, বরং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ডিজিটাল সংযোগের একটি সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্টারলিংকের আগমন বাংলাদেশের ডিজিটাল যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এই প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে এর উচ্চ মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা যায় কি না, তার ওপর। আপাতত সম্ভাবনা ও প্রশ্ন, দুটোই পাশাপাশি হেঁটে চলেছে।
স্টারলিংক এর ভালো বিশ্লেষণ.

Keep following আরিফ হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Follow