ফ্রিল্যান্সিং আয়ে বিশ্বে অষ্টম স্থানে থাকা বাংলাদেশ এখন কর ছাড় ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে। জেনে নিন খাতটির সাম্প্রতিক চিত্র।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে দেশের তরুণেরা বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছেন। ঘরে বসে বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করে তারা যেমন বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন, তেমনি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিচ্ছেন।
বিশ্বে অষ্টম স্থান
এই খাতের শক্তি সংখ্যাতেই স্পষ্ট। বিখ্যাত পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেওনিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সিং আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের হিসাব বলছে, এই খাত থেকে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার আয় হয়। এত বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক আয় দেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চমূল্যের দক্ষতার দিকে
সাম্প্রতিক সময়ে কাজের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উচ্চমূল্যের দক্ষতার দিকে ব্যাপক ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো জটিল ও চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সাধারণ কাজের বদলে এই ধরনের বিশেষায়িত সেবা অনেক বেশি আয়ের সুযোগ এনে দিচ্ছে।
ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
এই খাতকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা বেশ উচ্চাভিলাষী। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দ্রুত বর্ধনশীল ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতের ওপর বড় ভরসা রাখা হচ্ছে। এই লক্ষ্যে সরকার কর ছাড়, স্টার্টআপ সহায়তা, ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করেছে।
সরকারি প্রণোদনা
উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বেশ কিছু আর্থিক সুবিধার ঘোষণা এসেছে। নিবন্ধিত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেবা, আমদানি করা সেবা এবং কার্যালয় ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি পাবে। এর পাশাপাশি স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার জন্য শূন্য শতাংশ টার্নওভার করের হারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই ধরনের প্রণোদনা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পথ অনেকটাই সহজ করে দেয়। ব্যবসার শুরুতে করের বোঝা কমে গেলে তরুণেরা ঝুঁকি নিয়ে নতুন কিছু গড়ার সাহস পান। এতে করে সীমিত পুঁজি নিয়েও অনেকে নিজেদের স্বপ্নের প্রকল্প শুরু করতে পারেন, যা সামগ্রিকভাবে উদ্ভাবনের একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
স্টার্টআপ বাস্তুতন্ত্র
দেশের স্টার্টআপ পরিমণ্ডলও দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সক্রিয় স্টার্টআপের সংখ্যা এক হাজার দুইশর বেশি, এবং এ পর্যন্ত প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্টার্টআপ কানেক্ট নামের উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো ই-কমার্স, ফিনটেক ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে মনোযোগ দিচ্ছে।
দক্ষতা উন্নয়ন
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে দক্ষতার স্বীকৃতি জরুরি। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার ও সেবাদাতাদের জন্য একটি স্মার্ট স্কিল ব্যাংক এবং একটি যাচাইকরণ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিজিটাল সনদ দেওয়া হবে, যা বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তরুণদের বিশাল সুযোগ

এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা তাদের সামনে এমন সব সুযোগ এনে দিয়েছে যা আগের প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারেনি। একটি ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও একজন তরুণ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে পারেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাত শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই আনছে না, বরং লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থানের একটি নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হচ্ছে। এটি দেশের ওপর থেকে বেকারত্বের চাপ কিছুটা কমাতে এবং একটি দক্ষ, প্রযুক্তিসচেতন কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং সহজ আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই ভিত্তি যত মজবুত হবে, দক্ষ জনশক্তি তত বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে এবং অর্জিত গতি ধরে রাখতে পারবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের চিত্র বলছে বাংলাদেশ তার ডিজিটাল ভবিষ্যতের ভিত গড়তে বেশ আন্তরিক। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, সরকারি সহায়তা এবং বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মিলে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাত সত্যিই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।

Keep subscribing to আরিফ হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
