সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে এই উত্থানের কারণ এবং রিজার্ভের ওপর এর প্রভাব সংখ্যাসহ তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়, আর সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে সেই আয় স্পর্শ করেছে একেবারে নতুন এক উচ্চতা। বিদেশের মাটিতে থাকা লাখো কর্মীর পাঠানো অর্থ কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলছে, সেই গল্পই এই লেখায় সংখ্যাসহ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
রেকর্ড ভাঙল রেমিট্যান্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড পরিমাণ ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটিই এখন পর্যন্ত এক অর্থবছরে আসা সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিক আগের অর্থবছরের তুলনায় এবারের এই অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, সেখান থেকে এবার তা প্রায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে গিয়ে এই নতুন রেকর্ডটি গড়ে তুলেছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়লেও গতি কিছুটা কম
তবে সংখ্যাটি রেকর্ড হলেও প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে খানিকটা সতর্কতাও রয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে রেমিট্যান্স বেড়েছিল প্রায় ২৭ শতাংশ, যা ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির। সেই তুলনায় এবারের প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা ধীর হয়ে এসেছে।
এই তুলনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, রেমিট্যান্সের মোট পরিমাণ বাড়লেও বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধির হার আগের চেয়ে খানিকটা কমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত উঁচু ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে, তাই এই গতি কমাকে খুব একটা অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
এই উত্থানের পেছনে যা আছে
এই রেকর্ড অর্জনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে সামনে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাজারভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে, কারণ এতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো প্রবাসীদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ লেনদেনের ওপর কড়া নজরদারিও ভালো কাজে দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ায় সাধারণ প্রবাসী কর্মীরা এখন অনেক সহজে ও নিরাপদে ব্যাংকিং মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন।
প্রবাসীর ঘামে ভরছে রিজার্ভ

রেমিট্যান্সের এই উত্থান সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ এবং আমদানি চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের রিজার্ভ ধীরে ধীরে পুনরায় ভরে উঠতে শুরু করেছে।
শুধু রিজার্ভই নয়, প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের অসংখ্য পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই আয় পরিবারগুলোর আয় বাড়ায়, অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদাকে চাঙা রাখে এবং সব মিলিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
সামনের বছরের লক্ষ্য
সামনের অর্থবছরকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনাও বেশ উচ্চাভিলাষী বলে মনে হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ শতাংশ, আর রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ শতাংশ পর্যন্ত।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে রিজার্ভের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের লক্ষ্য পূরণের আশা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার প্রত্যাশা করছে যে আগামী অর্থবছরের শেষ নাগাদ মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যদি প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী থাকে।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে প্রায় ৮ লাখ ৫৭ হাজার কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রবাসী কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত এই রেকর্ড আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোকে আরও সহজ করা এবং কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাই হবে সামনের দিনগুলোর মূল করণীয়।

Keep subscribing to ফারিয়া হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
