মুদি থেকে শুরু করে গ্যাজেট, বাংলাদেশের মানুষ এখন হাতের মুঠোয় থাকা ফোন থেকেই কেনাকাটা সারছেন। দ্রুত বেড়ে ওঠা ই-কমার্স খাত ২০২৬ সালে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হচ্ছে, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
কয়েক বছর আগেও যেখানে কেনাকাটা মানেই ছিল ভিড় ঠেলে বাজারে যাওয়া, সেখানে আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ ঘরে বসেই ফোনের পর্দায় আঙুল ছুঁয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে ফেলছেন। মুদিপণ্য থেকে শুরু করে পোশাক, ইলেকট্রনিকস কিংবা ওষুধ, প্রায় সবকিছুই এখন অনলাইনে পাওয়া যায়, আর এই পরিবর্তনই দেশের অর্থনীতিতে নতুন এক গতি এনে দিচ্ছে।
দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি বাজার
বিভিন্ন গবেষণা ও পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত দ্রুত বড় হচ্ছে। কোনো কোনো হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার দশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, আবার কিছুটা রক্ষণশীল অনুমানে তা পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের ঘরে দাঁড়াতে পারে। যেভাবেই দেখা হোক, প্রবৃদ্ধির ধারা স্পষ্টভাবে ঊর্ধ্বমুখী।
এই উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ। দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার এখন পঁচাত্তর শতাংশেরও বেশি, স্মার্টফোন সহজলভ্য হয়েছে, আর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন সাধারণ মানুষের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। এসব মিলেই অনলাইনে কেনাকাটার পথ অনেকটা সহজ করে দিয়েছে।
যারা বাজার চালাচ্ছে

এই বিশাল বাজারে এখন একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করছে, যাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব শক্তির জায়গা। সবচেয়ে বড় ও সাজানো-গোছানো মার্কেটপ্লেস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে দারাজ, যেখানে প্রায় সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদিপণ্য পৌঁছে দেওয়ায় শক্ত অবস্থান গড়েছে চালডালের মতো প্রতিষ্ঠান।
বিশেষায়িত ক্ষেত্রেও গড়ে উঠেছে আলাদা আলাদা নাম, যেমন ইলেকট্রনিকস ও গ্যাজেটের জন্য পিকাবু কিংবা ছোট ও মাঝারি বিক্রেতাদের নিয়ে কাজ করা আজকের ডিলের মতো প্ল্যাটফর্ম। তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো ফেসবুকভিত্তিক এফ-কমার্সের বিস্ফোরণ, যেখানে অসংখ্য তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা ঘরে বসেই ব্যবসা শুরু করছেন।
এখনো বিশাল সম্ভাবনা
এত প্রবৃদ্ধির পরও একটি পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয় যে যাত্রা কেবল শুরু। দেশের মোট খুচরা বিক্রির মাত্র তিন থেকে পাঁচ শতাংশ এখন অনলাইনে হয়, অর্থাৎ বাকি বিশাল অংশ এখনো প্রচলিত দোকানকেন্দ্রিক। এই সংখ্যা একদিকে যেমন খাতটির অপরিপক্বতা বোঝায়, তেমনি সামনের দিনগুলোর জন্য বিপুল সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দেয়।
ভবিষ্যতের বড় সুযোগটি লুকিয়ে আছে শহরের বাইরে। এত দিন ই-কমার্স মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক থাকলেও ধীরে ধীরে ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়ছে মফস্বল ও গ্রামের দিকে। যদি প্রত্যন্ত এলাকার ক্রেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য পৌঁছানো যায়, তবে এই বাজার কয়েক গুণ বড় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
চ্যালেঞ্জগুলো
তবে এই পথ কাঁটামুক্ত নয়। সবচেয়ে বড় বাধা হলো সরবরাহ ও ডেলিভারি অবকাঠামো, কারণ সময়মতো ও অক্ষত অবস্থায় পণ্য পৌঁছানো এখনো অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্যাশ অন ডেলিভারির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খরচ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো ভোক্তার আস্থা। অতীতে কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনা অনেক ক্রেতার মনে সংশয় তৈরি করেছিল। তাই স্বচ্ছ নীতিমালা, ভোক্তা সুরক্ষা এবং প্রতারণা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া এই খাতের টেকসই বিকাশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনীতিতে প্রভাব
ই-কমার্স কেবল কেনাকাটার একটি নতুন মাধ্যম নয়, এটি অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির বড় উৎসও হয়ে উঠছে। ডেলিভারিকর্মী থেকে শুরু করে গুদামকর্মী, ছোট বিক্রেতা এবং বিশেষত ঘরে বসে ব্যবসা শুরু করা নারী উদ্যোক্তারা এই খাতের মাধ্যমে আয়ের নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন, যা সমাজের তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
এভাবে ই-কমার্স ধীরে ধীরে দেশের বৃহত্তর ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, যেখানে অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল বিপণন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর ডিজিটাল রূপান্তর ঘটলে সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাও বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সামনের পথ
সামনের দিনগুলোতে এই খাতের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করা, ডেলিভারি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ক্রেতার আস্থা পুনর্গঠন করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। এই ভিতগুলো মজবুত হলে বাজারের প্রবৃদ্ধি কেবল সাময়িক প্রবণতা না থেকে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভাবনা যেমন আকাশছোঁয়া, তেমনি করণীয়ও অনেক। যদি প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক ও ভোক্তারা একসঙ্গে সঠিক পথে এগোতে পারেন, তবে হাতের মুঠোয় থাকা এই ছোট্ট পর্দাই হয়ে উঠতে পারে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় জানালা।

Keep subscribing to ফারিয়া হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
