শেয়ারবাজারের টানা পতন ও লভ্যাংশ ঘোষণার প্রভাবহীনতার মাঝে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন সঞ্চয়পত্রে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এখানকার নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা ও মধ্যবিত্তের নিরাপত্তা চাহিদা নিয়ে এই আনুমানিক সঞ্চয়ের গল্প।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৪ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্টে বন্ধ হলে বিনিয়োগকারীদের মুখে হাসি নেই। ওয়ালটন হাইটেক বা অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মতো ব্লুচিপ কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, তবুও শেয়ারদর বাড়েনি। এই অবস্থায় মানুষের দৃষ্টি পড়েছে একটা পুরনো কিন্তু আশ্চর্যকরভাবে নতুন হয়ে ওঠা মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। আগস্ট মাসে এক বছরের মধ্যে নিট বিক্রি বেড়েছে ১২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। শেয়ারবাজারের অস্থিরতা আর ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তার মাঝে এই সংখ্যাটা মনে করিয়ে দেয় যে বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি নয়, নিশ্চিত মুনাফার পেছনে লুকিয়ে যাচ্ছেন।
বাজারের অস্থিরতা আর মানুষের বিকল্প
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে বড় কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই টানা বিক্রয়চাপ তৈরি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার চেষ্টা করছেন, যা বাজারের জন্য বিষ। একসময় এটা ছিল ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অভ্যাস, কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলোও একই ধরনের আচরণ করছে।
এই পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্র মধ্যবিত্তের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যাদের সামগ্রিক সঞ্চয়ের ক্ষমতা কম, তারা এমন জায়গায় টাকা রাখতে চান যেখানে ঝুঁকি কম এবং প্রয়োজনে দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়া যায়।
সংখ্যা বলছে কী
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ৪০৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এটা ছিল ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
জুলাই-আগস্ট দুই মাসে মোট নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকায়। এই প্রবৃদ্ধি মূলত দুটি কারণে এসেছে, ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শেয়ারবাজারের টানা পতন।
কেন মানুষ যাচ্ছেন সঞ্চয়পত্রে
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে অনিশ্চয়তা এবং শেয়ারবাজারের দুর্বলতা মানুষকে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমেছে, তাই তারা কম ঝুঁকির অপশন বেছে নিচ্ছেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের সিংহভাগ মধ্যবিত্ত। চাকরিজীবনের শেষ সম্বল এখানে বিনিয়োগ করে তারা সংসারের ব্যয় পরিচালনা করে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে, যা ব্যাংক আমানতের চেয়ে আকর্ষণীয়।
কর ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ অগ্রিম কর রয়েছে। এটা ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে স্বস্তি দিতে এই বাড়তি কর বাদ দিতে হবে। কর কমলে এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়বে।
সরকার সঞ্চয়পত্রের অর্থ দিয়ে বাজেটের ঘাটতি মেটায়। আবার এই অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়। তাই এটা শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগ নয়, দেশের অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিনিয়োগকারীর জন্য কী করণীয়
বিআইসিএম-এর আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা নিজেদের অ্যাকাউন্ট নিজেই পর্যবেক্ষণ করবেন, অন্যের উপর নির্ভর করবেন না। শর্ট-টার্ম প্রফিটের পেছনে ছুটতে বন্ধ করুন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে মনোযোগ দিন।
সঞ্চয়পত্রের মতো নিরাপদ মাধ্যমগুলোতে বিনিয়োগ করার সময় করের বিষয়টা ভালোভাবে ভেবে দেখুন। মধ্যবিত্ত হিসেবে আপনার প্রাথমিক চাহিদা হওয়া উচিত ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা এবং প্রয়োজনে অর্থের প্রাপ্যতা।
Frequently asked questions

Keep subscribing to ফারিয়া হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
