আউটসোর্সিং খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই ৯০০ মিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে, প্রায় ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজার তরুণ যুক্ত ফ্রিল্যান্সিংয়ে। এই ডিজিটাল অর্থনীতির উত্থান, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়েই আমার এই লেখা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির কথা উঠলে আমরা সাধারণত তৈরি পোশাক বা প্রবাসী আয়ের কথা ভাবি। কিন্তু একটি নতুন খাত নীরবে দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিচ্ছে। ঘরে বসে ল্যাপটপের সামনে কাজ করে হাজার হাজার তরুণ এখন বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য সেবা দিচ্ছেন এবং দেশে আনছেন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
রপ্তানি আয়ে নতুন মাইলফলক
সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, আউটসোর্সিং খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই খাতের আয় প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পথে রয়েছে।
তবে প্রকৃত চিত্র সম্ভবত আরও বড়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত আয় সরকারি হিসাবের অন্তত দ্বিগুণ, কারণ ফ্রিল্যান্সারদের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থ দেশে আনেন না। এর ফলে খাতটির আসল অবদান পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না বলেই ধারণা করা হয়।
তরুণদের হাতে গড়া খাত
এই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ফ্রিল্যান্সারের প্রায় ১৪ শতাংশই বাংলাদেশে রয়েছেন, যা সত্যিই একটি বিস্ময়কর তথ্য।
শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সিংই নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও খাতটি বড় হচ্ছে। দেশে এখন প্রায় সাড়ে চারশ বিপিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় নব্বই হাজার মানুষ সরাসরি কর্মসংস্থান পেয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কোম্পানির নানা ধরনের সেবা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে থাকে।
কী ধরনের কাজ হয়

এই খাতের কাজের পরিসর অনেক বিস্তৃত। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা এন্ট্রি থেকে শুরু করে কাস্টমার সাপোর্ট পর্যন্ত নানা ধরনের সেবা এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট কাজও দ্রুত বাড়ছে।
কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে, তার উত্তর মোটামুটি সহজ। তুলনামূলক কম খরচে দক্ষ ও ইংরেজি জানা তরুণ কর্মী পাওয়া যায় এখানে। ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এখনো অনেক পথ বাকি
তবে বাস্তবতা হলো, আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। ভারত আউটসোর্সিং থেকে বছরে প্রায় দুইশ বিলিয়ন ডলার আয় করে, আর ফিলিপাইনের আয় প্রায় পঁচাত্তর বিলিয়ন ডলার। তাদের তুলনায় আমাদের এক বিলিয়ন ডলার এখনো তুলনামূলক ছোট একটি সংখ্যা।
এই ব্যবধান কমাতে হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। উন্নত মানের প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজ আন্তর্জাতিক লেনদেনের ব্যবস্থা এবং দক্ষতার ক্রমাগত উন্নয়ন এখানে অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জন্য।
নীতি ও অবকাঠামোর ভূমিকা
সরকারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রিল্যান্সারদের আয় সহজে ও নিরাপদে দেশে আনার ব্যবস্থা, ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং তরুণদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করলে এই খাত আরও দ্রুত বড় হতে পারে। সঠিক নীতি সহায়তা পেলে এর সম্ভাবনা প্রায় সীমাহীন।
অর্থনৈতিকভাবে এই খাতের গুরুত্ব কেবল রপ্তানি আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। এটি লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করছে, বেকারত্ব কমাচ্ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ঘরে বসে উপার্জনের সুযোগ এনে দিচ্ছে, যা সামাজিক দিক থেকেও অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পরিবর্তন।
সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে
আমার কাছে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাত বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অন্যতম আশার আলো। তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি এই ডিজিটাল অর্থনীতি ধীরে ধীরে দেশের রপ্তানি খাতের নতুন একটি স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে, যদি আমরা সুযোগটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি।
আমি সামনের দিনগুলোতে এই খাতের অগ্রগতির দিকে নজর রাখব। এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক নিঃসন্দেহে একটি সূচনা মাত্র, শেষ নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও তরুণদের অদম্য চেষ্টায় বাংলাদেশ এই খাতে বিশ্বমঞ্চে আরও বড় জায়গা করে নিতে পারে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
ডিজিটাল অর্থনীতি: অন্য জায়গার চেয়ে ভালো.

Keep subscribing to ফারিয়া হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
