তৈরি পোশাকের ছায়া থেকে বেরিয়ে চামড়া ও পাদুকা খাত ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন ভরসা হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক অর্থবছরে এই খাতের আয় ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির কথা উঠলে সবার আগে মনে আসে তৈরি পোশাকের নাম। তবে এই একক নির্ভরতার বাইরে বেরিয়ে নতুন শক্তি খুঁজে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন সবাই অনুভব করছেন। ঠিক সেই জায়গা থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসছে চামড়া ও পাদুকা শিল্প, যা দেশের রপ্তানির দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
রপ্তানি আয়ের নতুন দিগন্ত
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের খাত বহু বছর ধরে সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি বহন করে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা বাস্তব সংখ্যায় প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। কাঁচা চামড়া, তৈরি চামড়া, পাদুকা এবং চামড়ার নানা পণ্য মিলিয়ে এই খাত এখন উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, সঠিক নীতি সহায়তা পেলে এই ধারা আরও বেগবান হবে।
সর্বশেষ রপ্তানি চিত্র
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় এক দশমিক দুই তিন বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে এই খাতের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় সাত দশমিক শূন্য সাত শতাংশ বেশি। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি একাই প্রায় চারশ কোটি ডলারের কাছাকাছি অবদান রেখেছে।
পাদুকা শিল্পের চিত্র

চামড়া খাতের ভেতরে পাদুকা শিল্পের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এই উপখাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং প্রায় নব্বইটি বড় কারখানা কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান মিলে বছরে আনুমানিক সাঁইত্রিশ কোটি আট লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করে, যা দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে।
বিশাল কর্মসংস্থান
এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সামাজিক অবদান হলো কর্মসংস্থান। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, চামড়া ও পাদুকা খাত মিলিয়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই কর্মীদের প্রায় ষাট শতাংশই নারী। ফলে এই খাত কেবল রপ্তানি আয় নয়, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও বড় ভূমিকা রাখছে।
পাঁচ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন
সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তারা এই খাত নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছেন। তাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। বর্তমান অবস্থান থেকে এই লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও সংস্কার হলে তা অর্জন সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী
দেশের চামড়া শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠেছে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী। রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর এই অঞ্চলটি এখন প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। তবে পরিকল্পিত এই শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হলেও এর পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা কাজে লাগাতে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
এই খাতের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা। সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় বর্জ্য শোধন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই দুর্বলতা কেবল পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সনদের গুরুত্ব
বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের স্বীকৃতি অপরিহার্য। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের মতো আন্তর্জাতিক সনদ ছাড়া বড় ব্র্যান্ডের কাছে পণ্য বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে সাভারের ট্যানারি অঞ্চলে খুব অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানই এই ধরনের স্বীকৃতি অর্জন করতে পেরেছে, যা এখনো একটি বড় দুর্বলতা।
তিনটি বিশেষায়িত অঞ্চল
সমস্যা সমাধানে সরকার নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাভার, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে তিনটি বিশেষায়িত চামড়া শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে, যেগুলো পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হবে। এই উদ্যোগ সফল হলে খাতটির টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হওয়ার পথ অনেকটাই সুগম হবে।
বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজন
একক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো অর্থনীতির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। সেই বাস্তবতা থেকেই চামড়া খাতকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি এই খাত দাঁড়াতে পারলে দেশের রপ্তানি ঝুড়ি আরও বৈচিত্র্যময় হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা ঝাঁকুনি সামলানোর সক্ষমতাও বাড়বে।
সামনের পথ
সব মিলিয়ে চামড়া ও পাদুকা শিল্প বাংলাদেশের জন্য এক বিপুল সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। পরিবেশগত জটিলতা কাটিয়ে, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করে এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারলে এই খাত ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সঠিক পরিকল্পনাই এখন এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি।

Keep subscribing to ফারিয়া হোসেনHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
