বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে ঘোষিত কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রকল্পের বিশ্লেষণ ও চ্যালেঞ্জ
ঢাকার বাংলা একাডেমি ভবনের সেমিনার হলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম. এ. মুহিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সুর ছিল আবেগপ্রবণ নয়, বরং একধরনের নিরীক্ষামূলক স্বীকারোক্তি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বহু বছর ধরে আমরা কেবল ইট-কাঠের বিশাল ভবন গড়ে তুলেছি, দামি যন্ত্রপাতি কিনে রেখেছি, কিন্তু সেখানে সেবা দেওয়ার মতো দক্ষ মানুষ ছিল না। এই ভুল সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এই স্বীকারোক্তিটা আসলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক নীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ১৩ অক্টোবর দুপুরে ‘সামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য: অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজকল্যাণের সোপান’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বড় শহরের বিশেষায়িত হাসপাতালের চার দেয়ালে আটকে থাকা মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে এবার গ্রামের পথের ধারে, মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রয়াস
সরকারের এই নতুন কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রকল্পের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রাথমিকভাবে ২০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও, ধাপে ধাপে দেশের ৫০০টি উপজেলায় এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মানে হলো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আর কেবল ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট বা পাবনার মানসিক হাসপাতালের মতো কেন্দ্রীয় স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রতিমন্ত্রীর মতে, ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনার মানসিক হাসপাতালের সেবাকে জেলা ও উপজেলা স্তরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই এই প্রকল্প সাজানো হয়েছে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা দূরদূরান্তের এলাকায় বসবাস করেন, তারা সহজেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আধুনিক যুগের মানসিক সংকট
বিশ্বমানসিক স্বাস্থ্য দিবসের এই উপলক্ষে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য এখন সারা বিশ্বেই একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ-সংঘাত, দ্রুত পরিবর্তনশীল লাইফস্টাইল, একাকীত্ব ও অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর ক্ষত তৈরি করছে।
একটি চমকপ্রদ উপমা দিয়ে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন। ‘প্রযুক্তির যুগে আমরা আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকেই এক একটি বিচ্ছিন্ন “দ্বীপে” পরিণত হচ্ছি।’ বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর-কিশোরীরা এর বড় শিকার। এই পর্যবেক্ষণটি আমাদের সমাজের বর্তমান অবস্থার একটি সঠিক প্রতিফলন।

জনবলের সংকট ও সমন্বয়ের প্রয়োজন
কিন্তু এই উদ্যোগের সামনে একটি বিশাল বাধা রয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী স্বচ্ছভাবে এই চ্যালেঞ্জের কথা বলেন। সেবা দেওয়ার দক্ষ জনবল না থাকলে ভবন বা যন্ত্রপাতি কোনো কাজের নয়।
এছাড়া, তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকর রূপ দিতে মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ‘মানসিক স্বাস্থ্য শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা দরকার।’ এই বক্তব্যটি দেখায় যে, মানসিক স্বাস্থ্য একটি বহুমাত্রিক সমস্যা যা একাধিক খাতের সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশা রাখে।

স্টিগমা দূরীকরণের গুরুত্ব
মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের মানবাধিকার রক্ষা, দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন এবং সামাজিক কুসংস্কার ও ‘স্টিগমা’ দূর করা এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, মানুষের মর্যাদা বা ‘হিউম্যান ডিগনিটি’ রক্ষা করা যে কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে মৌলিক বিষয়।
স্টিগমা দূর করা কেবল একটি সামাজিক উদ্যোগ নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়া। যখন মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে লজ্জা বা ভয় পায়, তখন সেবা পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চাওয়া হচ্ছে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে কোনো লজ্জা বা ভয় থাকবে না।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
এই প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে কতগুলো বাস্তবিক বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ২০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্পের সাফল্য। দ্বিতীয়ত, ৫০০টি উপজেলায় সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল তৈরি করা। তৃতীয়ত, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা।
এছাড়া, সামাজিক স্টিগমা দূর করা এবং মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রকল্প যদি সফল হয়, তবে বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
Frequently asked questions

Keep subscribing to আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
