আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত ১৩.৯ মিলিয়ন, যা ২০৫০ সালে ২৩ মিলিয়ন ছাড়াতে পারে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও খাদ্যাভ্যাস বড় ঝুঁকি।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। রোগটি নিয়ে বহু মানুষ এখনও যথেষ্ট সচেতন নন, অথচ আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিবছর উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা এখনই থামাতে না পারলে সামনে দেশের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ তৈরি হবে।
সমস্যার আকার বোঝাতে কয়েকটি সংখ্যাই যথেষ্ট। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩.৯ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। এই বিপুল সংখ্যা কেবল রোগীদের নয়, বরং তাঁদের পরিবার এবং গোটা সমাজের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্রুত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
গত দুই দশকে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, তা সংখ্যাতেই স্পষ্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৮ মিলিয়ন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৯ মিলিয়নে। অর্থাৎ চব্বিশ বছরে সংখ্যাটি প্রায় আটগুণ হয়ে গেছে।
ভবিষ্যতের চিত্র আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যা ২৩.১ মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার প্রায় ১৩.২ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও যথেষ্ট বেশি বলে বিবেচিত হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্যতম শীর্ষে
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগ বাড়ায়। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ডায়াবেটিসের বোঝা যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষে অবস্থান করছে।
এই পরিসংখ্যান কেন এত ভয়ংকর, তা বুঝতে খুব বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। ডায়াবেটিস কেবল রক্তে শর্করার সমস্যা নয়, বরং এটি হৃদরোগ, কিডনি বিকল ও চোখের ক্ষতিসহ নানা জটিলতার পথ খুলে দেয়, যা রোগীর জীবনমান এবং পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
তরুণদের মধ্যেও ছড়াচ্ছে
আগে ডায়াবেটিসকে মূলত মধ্যবয়সী বা বয়স্কদের রোগ হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু সেই ধারণা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪.৫ শতাংশ তরুণ কম বয়সেই টাইপ-টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রি-ডায়াবেটিসের বিশাল ঝুঁকিও। একই তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮.৪ শতাংশ প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছেন। যথাসময়ে সতর্ক না হলে এই বিপুল অংশ পরবর্তীতে পুরোপুরি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
কেন বাড়ছে ডায়াবেটিস
এই দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে জীবনযাত্রার পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখছে। প্রতিবেদনে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে ডায়াবেটিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নগরায়ণ, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা এবং হাঁটাচলার অভাব মিলে সমস্যাটিকে আরও গভীর করে তুলছে।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করার ব্যাপক ব্যবহার শরীরে শর্করা নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। ভারসাম্যহীন খাদ্য এবং পর্যাপ্ত শাকসবজি না খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি আরও অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধই মূল চাবিকাঠি

আশার কথা হলো, ডায়াবেটিস অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এই লড়াইয়ের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত ব্যায়াম করতে অনীহা দেখান, যা প্রতিরোধের পথে বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ছোট ছোট অভ্যাসই আসলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা, ভারসাম্যপূর্ণ খাবার গ্রহণ, চিনি ও লবণ কমানো এবং নিয়মিত রক্তের শর্করা পরীক্ষা করানো ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
সামনের পথ
এই মহামারি মোকাবিলায় প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। জনসচেতনতা বাড়ানো, সহজলভ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে মানুষকে উৎসাহিত করা, এই সবকিছু একসঙ্গে না এগোলে ক্রমবর্ধমান এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে, পরিসংখ্যান যতই ভয় ধরাক না কেন, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা মূলত সুস্থ জীবনযাত্রার মাধ্যমেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই সচেতনতা এবং সময়মতো পদক্ষেপই ঠিক করে দেবে, বাংলাদেশ এই নীরব মহামারিকে থামাতে পারবে, নাকি ভবিষ্যতের ভয়ংকর সংখ্যাগুলোই সত্যি হবে।
স্বাস্থ্য এর ভালো বিশ্লেষণ.
স্বাস্থ্য ঘিরে ভালো প্রসঙ্গ.

Keep following আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Follow