রোগ থেকে বাঁচাতে বসানো নলকূপই কীভাবে কোটি মানুষের শরীরে নীরবে বিষ ঢেলেছে? বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক ভূগর্ভস্থ পানি নিরাপদ মাত্রার বেশি আর্সেনিকে দূষিত, ঝুঁকিতে সাড়ে তিন থেকে সাত কোটির বেশি মানুষ। এই নীরব মহামারির উৎস, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জলবায়ুর নতুন হুমকি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ।
ডেঙ্গু, হাম কিংবা বায়ুদূষণের মতো দৃশ্যমান স্বাস্থ্য সংকটগুলো যখন প্রতিনিয়ত আলোচনায় থাকে, তখন বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে একটি নীরব বিষ বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে মানুষের শরীর গ্রাস করছে। এটি কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নয়, বরং প্রকৃতিরই একটি উপাদান—আর্সেনিক। ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে থাকা এই বিষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণবিষক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, অথচ এর সমাধান আজও অধরা রয়ে গেছে।
কোটি কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকিতে
সমস্যার ব্যাপকতা বুঝতে হলে প্রথমেই এর ভয়াবহ পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হয়। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৯ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানিতেই আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এর সরাসরি অর্থ হলো, দেশের বিশাল একটি অংশের পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
মানুষের সংখ্যার হিসাব করলে এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং শিউরে ওঠার মতো। অনুমান করা হয়, দেশে সাড়ে তিন কোটি থেকে শুরু করে সাত কোটি সত্তর লক্ষ পর্যন্ত মানুষ এই নিরাপদ মাত্রার বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানির সংস্পর্শে রয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন পানীয় জলে বিষের উপস্থিতি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
নির্ধারিত মান বনাম কঠিন বাস্তবতা
এই সংকটের একটি জটিল দিক লুকিয়ে আছে নিরাপত্তা মানের পার্থক্যের মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ মাত্রা প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রামে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করে। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় মান এখনো প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রামেই আটকে আছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার পাঁচ গুণ বেশি এবং ঝুঁকিকে অনেকাংশে আড়াল করে রাখে।
বাস্তব পরিস্থিতি এই নির্ধারিত মানকেও বহু জায়গায় ছাড়িয়ে গেছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে। কিছু কিছু এলাকায় পানিতে আর্সেনিকের ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সীমার চেয়ে ৩০ গুণেরও বেশি, অর্থাৎ প্রতি লিটারে ৩১১ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। এমন উচ্চমাত্রার বিষ দীর্ঘদিন ধরে পান করলে তার পরিণতি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
নলকূপের করুণ পরিহাস

এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো এর উৎপত্তির ইতিহাস, যা এক নিষ্ঠুর পরিহাসের মতো। এক সময় ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত পেটের রোগ থেকে মানুষকে বাঁচাতে সারা দেশে লক্ষ লক্ষ নলকূপ বসানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ—দূষিত পুকুর বা নদীর পানির বদলে মানুষকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা এবং রোগবালাই কমিয়ে আনা।
কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞে একটি মারাত্মক ভুল থেকে গিয়েছিল যা পরবর্তীতে ভয়াবহ রূপ নেয়। যে অগণিত নলকূপ বসানো হয়েছিল, সেগুলোর পানি আর্সেনিক দূষণের জন্য পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। ফলে জীবাণুবাহিত রোগ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যে পানি নিরাপদ ভেবে পান করতে শুরু করল, সেই পানিই তাদের শরীরে বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে বিষ জমা করতে থাকল।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর প্রভাব
দীর্ঘমেয়াদে দূষিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে আর্সেনিক প্রবেশ করলে তা বহু জটিল রোগের জন্ম দেয়। এর মধ্যে রয়েছে আর্সেনিকোসিস নামের ত্বকের রোগ, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, স্নায়বিক ও হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, কিডনি ও প্রজননতন্ত্রের জটিলতা এবং একাধিক অঙ্গের ক্ষতি। কার্যত পুরো শরীরকেই এই বিষ ভেতর থেকে দুর্বল করে দিতে থাকে।
সবচেয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করে সমাজের সবচেয়ে অসহায় সদস্যরা, অর্থাৎ শিশুরা। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে আর্সেনিকের সংস্পর্শ শিশুমৃত্যু, মৃত সন্তান প্রসব, অকাল জন্ম ও কম ওজন নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া এটি শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত করা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া, এমনকি বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ হ্রাস এবং স্নায়বিক বিকাশে বাধার সঙ্গেও যুক্ত।
জলবায়ু সংকট বিপদকে আরও গভীর করছে
যেন বিদ্যমান সংকট যথেষ্ট ছিল না, জলবায়ু পরিবর্তন এই বিপদকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তার ফলে ভূগর্ভে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ভূগর্ভস্থ জলাধারে রাসায়নিকভাবে আর্সেনিককে আরও সক্রিয় করে তুলছে। এর ফলে ক্যান্সার ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আর্সেনিক সংকট শুধু একটি পুরনো সমস্যা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি। এই নীরব মহামারি মোকাবিলায় প্রয়োজন নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করা, নিয়মিত নলকূপ পরীক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কোটি কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা রক্ষায় এই নীরব বিষের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ভূগর্ভস্থ পানি সম্পর্কে খুব দরকারি লেখা.
শেষ পর্যন্ত উপভোগ করলাম.
এখানে ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে অনেক শিখলাম.

Keep following আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Follow