avalw
HEALTH · BD

অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা: বাংলাদেশে একদিকে খর্বতা, অন্যদিকে দ্বিগুণ হওয়া স্থূলতার নীরব সংকট

আয়েশা রহমান আয়েশা রহমান ayesharahman.avalw.com · 3.9k reads Respect0 Save Share Read only
READS337live count PUBLISHED28 Aug2026 READING TIME3 min610 words LANGUAGEBengali
AI CITATIONS? Gathering data

বাংলাদেশ যখন শিশুর অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়ছে, তখনই বড়দের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা দুই দশকে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। শহরে প্রায় ২৪ শতাংশ, গ্রামে ১৪ শতাংশ। নারীদের রক্তস্বল্পতা আটকে আছে ৩৬.৭ শতাংশে। অপুষ্টির এই দ্বৈত বোঝার গভীরে এক নজর।

বাংলাদেশের পুষ্টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের চোখে সাধারণত ভাসে অপুষ্টিতে ভোগা শীর্ণকায় শিশুর ছবি, যা দশকের পর দশক ধরে দেশের বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে আছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও দ্বিমুখী, কারণ একই সময়ে দেশের ভেতরে সম্পূর্ণ বিপরীত আরেকটি সংকট নীরবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যা অনেকের চোখেই এখনো ধরা পড়েনি।

দুই বিপরীত সংকট এক দেহে

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করছেন অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা হিসেবে, যা বুঝতে না পারলে সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করা কঠিন। এর অর্থ হলো, একদিকে যখন দেশের বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো খর্বতা ও কৃশতার মতো কম পুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছে, ঠিক তখনই প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে।

একসময় ধারণা করা হতো, কম খাওয়া বা অপুষ্টিই বুঝি একমাত্র সমস্যা, আর বাড়তি ওজন কেবল ধনী দেশের রোগ। কিন্তু এই ধারণা আজ সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে, কারণ একই পরিবারে, এমনকি একই ছাদের নিচে এখন কম ওজনের শিশু আর বাড়তি ওজনের বড়দের সহাবস্থান দেখা যাচ্ছে, আর এই বৈপরীত্যই আজ দেশের পুষ্টি-চিত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা: বাংলাদেশে একদিকে খর্বতা, অন্যদিকে দ্বিগুণ হওয়া স্থূলতার নীরব সংকট

দুই দশকে দ্বিগুণ স্থূলতা

এই নতুন সংকটের ভয়াবহতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে, যা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। তথ্য বলছে, গত দুই দশকে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যা দেশের বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের এক স্পষ্ট প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

শহর ও গ্রামের মধ্যে এই সমস্যার পার্থক্যও বেশ চোখে পড়ার মতো এবং তাৎপর্যপূর্ণ। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার পৌঁছেছে প্রায় ২৪ শতাংশে, যেখানে গ্রামাঞ্চলে এই হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও উদ্বেগজনক, অর্থাৎ প্রায় ১৪ শতাংশ, যা দ্রুত বাড়ছে।

নারীদের রক্তস্বল্পতার অচলাবস্থা

দ্বৈত বোঝার আরেকটি দিক লুকিয়ে আছে দেশের নারীদের স্বাস্থ্যের ভেতরে, বিশেষ করে অণুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতিতে। উপাত্ত বলছে, পনেরো থেকে ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সী প্রজননক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩৬.৭ শতাংশ, এখনো রক্তস্বল্পতা তথা অ্যানিমিয়ায় ভুগছেন, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয়টি হলো এই ক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্র, যা কার্যত থমকে আছে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নারীদের রক্তস্বল্পতা কমিয়ে আনার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দিকে দেশ কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিই করতে পারেনি, যার ফলে মাতৃ ও শিশু পুষ্টির বেশ কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে।

ছোট্ট শিশুর পাতেও অস্বাস্থ্যকর খাবার

এই সংকটের বীজ যে কত অল্প বয়সেই বপন হচ্ছে, তা বোঝা যায় শিশুদের খাদ্যাভ্যাসের এক উদ্বেগজনক তথ্য থেকে। জরিপে দেখা গেছে, ছয় থেকে তেইশ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের হার অত্যন্ত বেশি, প্রায় ৬১.৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজনের বেশি শিশুই এই বয়সে ক্ষতিকর খাবারের সংস্পর্শে আসছে।

এই খাবারের তালিকায় রয়েছে চিনিযুক্ত পানীয় ও প্যাকেটজাত ক্ষতিকর খাদ্যের মতো উপাদান, যা কোমল বয়সেই শিশুর স্বাদ ও অভ্যাসকে বিকৃত করে দিচ্ছে। জীবনের একেবারে শুরুতেই এমন অভ্যাস গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে স্থূলতা ও নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে গোটা প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

কেন এমন হচ্ছে

এই দ্বৈত সংকটের পেছনে কাজ করছে দেশের দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা, যাকে বিশেষজ্ঞরা পুষ্টি রূপান্তর বলে অভিহিত করছেন। নগরায়ণ, বসে থাকা কাজের প্রবণতা এবং সহজলভ্য প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবারের বিস্তার মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে, যার পরিণতিতে একসঙ্গে দুই ধরনের অপুষ্টি জন্ম নিচ্ছে।

অর্থাৎ, একই আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ফলে কেউ পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আবার কেউ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করছেন অথচ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাচ্ছেন না। এই জটিল বাস্তবতা প্রমাণ করে যে শুধু বেশি খাবার নয়, বরং সঠিক ও মানসম্মত খাবারই এখন আসল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাধানের পথ

এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার খাদ্যব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে, যা কেবল একটি রোগ বা একটি বয়সের দিকে না তাকিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নেয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করা, খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মকানুন জোরদার করা এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ফর্টিফায়েড খাবারের প্রসার ঘটানো।

শেষ বিচারে, অপুষ্টির এই দ্বৈত বোঝা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুষ্টির লড়াই আর কেবল ক্ষুধা দূর করার লড়াই নয়। এটি এখন সঠিক খাবার, সচেতনতা ও সুষম জীবনযাত্রার এক বৃহত্তর সংগ্রাম, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ, শহর থেকে গ্রাম, সবাইকে একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ।

1 responses

বাংলাদেশে শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে দারুণ কভারেজ.

2
আয়েশা রহমান
Follow this desk
আয়েশা রহমান
Create a free account to follow আয়েশা রহমান. New stories land in your feed, and you can save any of them to your own reading lists.
Your library & lists →
আয়েশা রহমান
WRITTEN BY THE AUTHOR
আয়েশা রহমান 2026-08-28 · 3 min read · 337 reads
View profile →
VERIFY THIS STORY
ASK AI
আয়েশা রহমান Keep following আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Up next
More
Statistics Search Become a creator Alliances About Terms Privacy