বাংলাদেশে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও, খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক পরীক্ষায় ডালডা, মাখন ও তেলে ব্যাপক লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। কেন এই নীরব ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে, আর সুরক্ষার উপায় কী।
আমাদের প্রতিদিনের খাবারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে এক নীরব ঝুঁকি, যার নাম ট্রান্স ফ্যাট। বেকারির মুখরোচক খাবার থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের ভাজাপোড়া, অনেক জায়গাতেই এই ক্ষতিকর উপাদান থেকে যায়, অথচ আমরা অনেকেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নই।
ভালো খবর হলো, বাংলাদেশ এই সমস্যা মোকাবিলায় বেশ কয়েক বছর আগেই একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা কতটা মানা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু তথ্য সেই বাস্তবতার এক উদ্বেগজনক চিত্রই আমাদের সামনে তুলে ধরছে।
ট্রান্স ফ্যাট আসলে কী
সহজ করে বললে, ট্রান্স ফ্যাট হলো এক ধরনের ক্ষতিকর চর্বি, যা মূলত শিল্পোৎপাদিত তেল বা আংশিকভাবে হাইড্রোজেনযুক্ত তেল থেকে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেকারি ও রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত এ ধরনের তেলে ১০ শতাংশের বেশি ট্রান্স ফ্যাট পর্যন্ত থাকতে পারে, যা কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি।
এই চর্বি সরাসরি আমাদের হৃদযন্ত্রের ওপর আঘাত হানে। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, একই তেল বারবার ১৮০ থেকে ২০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম করলে এমন কিছু বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়, যা হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি অসুখের সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়।
বাংলাদেশের সাহসী পদক্ষেপ
এই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই দেশে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২১ প্রণয়ন করে, যেখানে খাবারে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাটের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
এই বিধিমালা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় আরেকটি তথ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ট্রান্স ফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও একটি।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, এই ২ শতাংশ সীমা যদি পুরোপুরি কার্যকর করা যায়, তাহলে প্রতিবছর প্রায় ১২,৩০০ জন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। অর্থাৎ, নিয়মটি শুধু কাগুজে বিষয় নয়, বরং হাজারো পরিবারের জন্য এটি জীবন-মরণের প্রশ্নের সঙ্গেই জড়িত।
বাস্তবতা: নিয়ম আছে, মানা নেই
কিন্তু সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফল রীতিমতো আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটির সর্বশেষ পরীক্ষায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত সয়াবিন তেলের নমুনার প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং মাখনের নমুনার প্রায় ৮৬ শতাংশেই ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ডালডার ক্ষেত্রে, যেখানে পরীক্ষিত ৯৫টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই, অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশে সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে। মার্জারিনের নমুনার ক্ষেত্রেও প্রায় ৪২ শতাংশে একই সমস্যা ধরা পড়েছে, যা নিয়ম আর বাস্তবতার বিশাল ফারাক স্পষ্ট করে তোলে।
কেন বাস্তবায়ন এত কঠিন
প্রশ্ন হলো, ভালো নিয়ম থাকা সত্ত্বেও কেন এই অবস্থা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পেছনে রয়েছে পরীক্ষাগারের সক্ষমতার ঘাটতি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের মতো কাঠামোগত দুর্বলতা, যা নিয়মটির যথাযথ প্রয়োগকে কঠিন করে তুলছে।
তবে কর্তৃপক্ষ যে একেবারে বসে নেই, তা-ও সত্য। কর্তৃপক্ষের একজন উপপরিচালকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত রমজান মাসে বিভিন্ন দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নজরদারি চালিয়ে ৭২০টির বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, যদিও এই প্রচেষ্টা আরও অনেক বাড়ানো জরুরি।
ভোক্তা হিসেবে আপনি কী করতে পারেন

রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি একজন সচেতন ভোক্তা হিসেবে আমাদেরও কিছু করণীয় আছে। যতটা সম্ভব ডালডা বা বনস্পতি দিয়ে তৈরি খাবার এবং একই তেলে বারবার ভাজা রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ, বিশেষত শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি খুবই জরুরি।
এর বদলে রান্নায় টাটকা তেল ব্যবহার এবং তা বারবার গরম না করাই ভালো অভ্যাস। পাশাপাশি বেশি করে শাকসবজি, ফল ও ঘরে তৈরি খাবারকে প্রাধান্য দিলে ট্রান্স ফ্যাটের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব, আর হৃদযন্ত্রও থাকে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও সুস্থ।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২ শতাংশ সীমা নির্ধারণ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় শুরু, কিন্তু তা কেবল শুরুই। সরকার, উৎপাদক ও ভোক্তা সবাই মিলে যথাযথ প্রয়োগ ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই নীরব ঝুঁকির হাত থেকে জাতির হৃদয়কে সত্যিকারভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য সম্পর্কে খুব দরকারি লেখা.

Keep following আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Follow