বাংলাদেশে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। এর কারণ, ঝুঁকি এবং সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিস্তারিত।
বাংলাদেশে একটি নীরব স্বাস্থ্য সংকট ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, আর তা হলো ডায়াবেটিস। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, অথচ অনেকে জানেনও না যে তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে আছেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবে সঠিক জীবনযাপন ও সচেতনতার মাধ্যমে এই রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
সংখ্যাগুলো সত্যিই চোখ খুলে দেওয়ার মতো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০০০ সালে ছিল প্রায় ১৮ লাখ, যা ২০১১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ লাখে এবং ২০২৪ সালে তা পৌঁছেছে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখে। ২০২৪ সালে দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.২ শতাংশে।
ভবিষ্যতের চিত্র আরও অনেক বেশি উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ আক্রান্ত নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ধারণা, ২০৪৫ সাল নাগাদ দেশটি সপ্তম স্থানে উঠে আসতে পারে।
গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে

একসময় ডায়াবেটিসকে নগরকেন্দ্রিক রোগ ভাবা হলেও এখন তা গ্রামেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ও উপ-শহর এলাকার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রি-ডায়াবেটিসের হার প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং ডায়াবেটিসের হার প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এই তথ্য স্পষ্ট করে দেয় যে সমস্যাটি আর কেবল বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বয়স ও লিঙ্গভেদে ঝুঁকির চিত্রও বেশ ভিন্ন দেখা যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার প্রায় ১ শতাংশ হলেও ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে তা ৩ শতাংশ এবং ৪৬ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে তা প্রায় ১৩ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া নারীদের মধ্যে আক্রান্তের হার পুরুষদের তুলনায় সামান্য বেশি বলে উঠে এসেছে।
কেন বাড়ছে ডায়াবেটিস
এই দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মূলত জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত নগরায়ণ, শারীরিক পরিশ্রমহীন অলস জীবনযাপন, পশ্চিমা ধাঁচের খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এই প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ। সমাজের অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রাগত রূপান্তরের সঙ্গে এই রোগের বিস্তার ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অবস্থাও ঝুঁকি অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেটের অতিরিক্ত মেদ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড এবং উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিসের বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৬১ শতাংশের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বলে জানা যায়।
প্রতিরোধই মূল চাবিকাঠি
ভয় পাওয়ার বদলে এখন সচেতন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি বিষয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিস প্রতিরোধের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অস্বাস্থ্যকর খাবার কমিয়ে এবং প্রতিদিনের চলাফেরা বাড়িয়ে অনেকাংশেই এই রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
আগেভাগে রোগ শনাক্ত করাও প্রতিরোধের একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশেষ করে অবহেলিত গ্রামীণ এলাকায় সম্প্রদায়ভিত্তিক স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সময়মতো শনাক্ত হলে জীবনযাত্রায় সাধারণ কিছু পরিবর্তন এনেই অনেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যেতে পারেন।
সুস্থ জীবনযাপনের পথ
প্রতিরোধের পথ আসলে খুব জটিল কিছু নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের মধ্যেই তা লুকিয়ে আছে। সুষম ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, চিনি এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত হাঁটাচলা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এই সবকিছুই ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছোট পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে বড় ফল বয়ে আনতে পারে।
এই লড়াইয়ে জনসচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষার ভূমিকা সত্যিই অপরিসীম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে ব্যাপক পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পরিবার, বিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্র সব জায়গা থেকেই যদি সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তবে এই ক্রমবর্ধমান সংকট অনেকটাই ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব।
সামনের পথ
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের এই উত্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও তা মোকাবিলা করা একেবারে অসম্ভব নয়। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং সুস্থ জীবনযাপনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিসংখ্যান বদলে দেওয়া সম্ভব। এখনই সময় নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হয়ে ওঠার।

Keep subscribing to আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
