ঘুম পুষ্টি ও ব্যায়ামের মতোই জরুরি, তবু অনেকেই তা অবহেলা করেন। প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুম দরকার, কম ঘুমের ঝুঁকি কী এবং ভালো ঘুমের সহজ উপায় কী, তা উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হলো।
সুস্থ থাকতে আমরা প্রায়ই সঠিক খাবার আর নিয়মিত ব্যায়ামের কথা ভাবি, কিন্তু ঘুমের বিষয়টি অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়। অথচ পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম শরীর ও মনের জন্য ঠিক ততটাই জরুরি। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ আর মোবাইলের পর্দা আমাদের ঘুমকে ক্রমশ ছোট করে আনছে। এই লেখায় উপলব্ধ তথ্য ও প্রকাশিত সূত্রের ভিত্তিতে আমরা দেখব, কেন ঘুম এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে ভালো ঘুম নিশ্চিত করা যায়।
ঘুম কেন এত জরুরি
প্রথমেই বোঝা দরকার ঘুমের প্রকৃত ভূমিকা। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী ঘুম জীবনের অন্যতম মূল ভিত্তি, যা পুষ্টি, পানি ও শারীরিক সক্রিয়তার মতোই সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। ঘুমের সময় শরীর তার তাপমাত্রা, রক্তচাপ ও শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখে। এমনকি মস্তিষ্ক এক ধরনের পরিচ্ছন্নতার কাজ করে, দিনভর জমে ওঠা ক্ষতিকর উপাদান পরিষ্কার করে। তাই ঘুম নিছক বিশ্রাম নয়, বরং শরীরের এক নিবিড় মেরামত প্রক্রিয়া।
কত ঘণ্টা ঘুম দরকার
স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, প্রতিদিন ঠিক কতটা ঘুম প্রয়োজন। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থভাবে কাজ করার জন্য প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম দরকার, আর আদর্শ সীমা ধরা হয় সাত থেকে নয় ঘণ্টা। হরমোনজনিত কারণে নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণত কিছুটা বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ঘুমের চাহিদা ব্যক্তিভেদে কিছুটা আলাদা হলেও, খুব কম ঘুম কারও জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়।
অনেকেই যথেষ্ট ঘুমান না
বাস্তবতা হলো, বহু মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমান। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে অন্তত একজন প্রতিদিন সাত ঘণ্টার কম ঘুমান। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০.৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক গড়ে স্বল্প সময় ঘুমিয়েছেন। এই প্রবণতা কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কম ঘুমের কারণ
ঘুম কম হওয়ার পেছনে নানা কারণ কাজ করে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পালাক্রমিক কাজের সময়সূচি, ঘুমের অচিকিৎসিত সমস্যা যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া, ঘুমানোর আগে পর্দার সামনে সময় কাটানো, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল গ্রহণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এর মধ্যে অন্যতম। স্থূলতা বা ডায়াবেটিসের মতো কিছু শারীরিক সমস্যাও ঘুম ব্যাহত করতে পারে। ফলে ভালো ঘুমের জন্য এই কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
শরীরের ওপর প্রভাব
কম ঘুমের প্রভাব শুধু ক্লান্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদে অপর্যাপ্ত ঘুম মৃত্যুঝুঁকি ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ টু ডায়াবেটিস ও আলঝেইমারের মতো রোগের আশঙ্কা বাড়ায়। কম ঘুম বিদ্যমান রোগকে আরও গুরুতর করে তোলে এবং ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই ঘুমকে অবহেলা করা মানে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিকে ডেকে আনা।
মন ও ঘুমের সম্পর্ক
ঘুমের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক গভীর। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতি রাতে পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমান, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতায় ভোগার দিনসংখ্যাও বেশি ছিল। ভালো ঘুম মেজাজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মনোযোগ বাড়ায় এবং দৈনন্দিন চাপ সামলানো সহজ করে তোলে। তাই সুস্থ মনের জন্যও পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য।
ঘুম, দুর্ঘটনা ও উৎপাদনশীলতা
ঘুমের অভাবের প্রভাব ব্যক্তির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী অপর্যাপ্ত ঘুম যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৭.৬ শতাংশের সঙ্গে জড়িত এবং কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাসের মাধ্যমে বছরে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে। ঘুমহীন অবস্থায় গাড়ি চালানো বা মনোযোগের কাজ করা তাই কেবল ব্যক্তিগত নয়, একটি সামাজিক ঝুঁকিও বটে। পর্যাপ্ত ঘুম এই বিপদগুলো অনেকটাই কমাতে পারে।
ভালো ঘুমের নিয়ম
সুখবর হলো, কিছু সহজ অভ্যাসেই ঘুমের মান উন্নত করা সম্ভব। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো ঘুমের একটি নিয়মিত সময়সূচি বজায় রাখা, অর্থাৎ প্রতিদিন, এমনকি ছুটির দিনেও, একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠা। শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি এতে স্থিতিশীল হয় এবং ঘুম গভীর হয়। ছোট এই অভ্যাসটি দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের মানে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
ঘরের পরিবেশ

ঘুমের ঘরটিও ঘুমের মানে বড় ভূমিকা রাখে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী শোবার ঘর অন্ধকার, শান্ত ও যন্ত্রপাতিমুক্ত রাখা উচিত, যাতে মস্তিষ্ক সহজে বুঝতে পারে যে ঘুমের সময় হয়েছে। বিশেষভাবে বলা হয়, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা অন্য পর্দা থেকে দূরে থাকা ভালো, কারণ মস্তিষ্কের ঘুমে প্রবেশের জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। আরামদায়ক ও ঠান্ডা একটি পরিবেশ ঘুমকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তোলে।
খাবার, পানীয় ও মন
ঘুমের আগে কী খাচ্ছি বা করছি, তারও প্রভাব আছে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন দুটোই ঘুমের মান নষ্ট করে, তাই সন্ধ্যার পর এগুলো এড়িয়ে চলা ভালো। যাঁদের বিছানায় শুয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা এলোমেলো ভাবনা ঘুম নষ্ট করে, তাঁদের জন্য জ্ঞানভিত্তিক আচরণগত থেরাপির মতো পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে। ঘুমানোর আগে ধীরস্থির একটি রুটিন মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
সুস্থতার সামগ্রিক ভিত্তি
সব মিলিয়ে ঘুমকে দেখা উচিত সুস্থতার একটি স্তম্ভ হিসেবে, ঠিক যেমন সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়াম। ভালো ঘুম পেশি পুনর্গঠন করে, স্মৃতিশক্তি ধরে রাখে এবং মেজাজ, ক্ষুধা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বিপাক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। বিশেষত ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা যাঁদের আছে, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম আরও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ঘুম ভালো হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যই উপকৃত হয়।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলা যায়, ঘুম আমাদের স্বাস্থ্যের এক অবহেলিত অথচ অপরিহার্য অংশ। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত সাত ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম শরীর ও মন উভয়ের জন্যই প্রয়োজন, আর এর অভাব নানা রোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। ভালো খবর হলো, নিয়মিত সময়সূচি, উপযুক্ত পরিবেশ ও সচেতন কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে ঘুমের মান উন্নত করা সম্ভব। তাই আজ থেকেই ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করা যেতে পারে।

Keep subscribing to আয়েশা রহমানHer next filing reaches you the moment it publishes, on her own subdomain.
Subscribe
